এভাবেও ফিরে আসা যায় | স্পোর্টস | দেশ রূপান্তর

আলোচনায় এসেছিলেন ওয়ানডে ফরম্যাট দিয়ে। রাখা হয়েছিল জাতীয় দলের রঙিন পোশাকের স্কোয়াডেই। তবু তাকে প্রথমে খেলানো হয় টেস্ট। তারপর টি-টোয়েন্টি। তবে আনামুল হক বিজয়ের জায়গা হচ্ছিল না ওয়ানডের একাদশে। অবশেষে আজ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সুযোগ হয় তার। একাদশে জায়গা পেয়েই বুঝিয়ে দিলেন ওয়ানডেই তার প্রিয় ফরম্যাট। ৭৩ রানের অনবদ্য এক ইনিংস যেন বলে দিল, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তাকে সবশেষ দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে। তারপর আর ফিরতে পারেননি। ফর্মহীনতায় চলে গিয়েছিলেন আড়ালে। তবে সবশেষ বিপিএল দিয়ে তিনি কিছুটা আলোচনায় এসেছিলেন। তারপর আবার হারিয়েও যান। কিন্তু এ বছর শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে বিজয় দূর্দান্ত খেলেছেন। এক মৌসুমেই ১৫ ম্যাচে ১১৩৮ রান করেন। যা লিস্ট এ ক্রিকেটে কোনো ক্লাবের হয়ে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ রান। এই ফর্ম দিয়েই নির্বাচকদের নজরে আসেন। ডাক পান ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের স্কোয়াডে।

ক্যারিবিয়ান সফরে বিজয়কে নেওয়া হয়েছিল রঙিন পোশাকের দলে। কিন্তু ইয়াসির রাব্বির চোটে আচমকাই টেস্ট দলের সঙ্গে যোগ দিতে হয় তাকে। বিসিবির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল অনেক। আফতাব আহমেদ একটা টকশোতে তখন বলেছিলেন, ‘একজন মিডল অর্ডারের পরিবর্তে আরেকজন মিডল অর্ডারকেই নেওয়া উচিত। তার জায়গায় কেন একজন ওপেনারকে নেওয়া হবে।’ তবে সেসব সমালোচনাকে ‍উপেক্ষা করে বিজয় শুধু দলের সঙ্গে যুক্তই হননি, দ্বিতীয় টেস্টে মুমিনুলের বদলে একাদশেও খেলেছিলেন। তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি।

টেস্ট শেষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ যখন শুরু হয়, তখনও একাদশে ছিলেন বিজয়। সেই সিরিজেও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি তিনি। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ যখন শুরু হয় তখন আবার একাদশে জায়গা হয়নি আনামুলের। নাজমুল হোসেন শান্তর ওপর ভরসা রেখেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট।

এর ব্যাখ্যায় অধিনায়ক তামিম ইকবাল বলেছিলেন, ‘শান্ত গত কয়েক সিরিজ ধরেই দলের সঙ্গে আছে, কিন্তু তাকে খেলানো হয়নি। এখন দলে নতুন একজন যুক্ত হওয়া মাত্রই তাকে একাদশে নেওয়া মানে শান্তর সঙ্গে অবিচার। একইসঙ্গে তাকে কয়েক সিরিজ ধরে দলের সঙ্গে রাখার সিদ্ধান্তটাও ভুল।’ তবে জিম্বাবুয়ে সফরে বিজয়কে খেলানো হবে বলেও জানিয়েছিলেন তামিম।

অবশেষে শুক্রবার হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একাদশে জায়গা হয় আনামুলের। সুযোগ পেয়ে সেটা কাজে লাগাতে ভুল করেননি তিনি। ৬২ বলে ৭৩ রানের ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দেন ওয়ানডেতেই তিনি সেরা। ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছিলেন ৬ চার ও ৩ ছক্কায়। দারুণ একটা প্রত্যাবর্তন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিজয়ের অভিষেক হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। অভিষেক ম্যাচে খেলেছিলেন ৪১ রানের অনবদ্য এক ইনিংস। পরে ম্যাচেই পেয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতকের দেখা। ৩৮ ম্যাচ খেলা আনামুলের রানও হাজার ছাড়িয়েছে। তিনটি অর্ধশতক আর সমান সংখ্যক শতক ছিল আজকের ম্যাচের আগ পর্যন্ত। গড়টাও ছিল ৩০ এর ওপরে। তবুও তাকে কাঠগড়ায় দাড় করানো হতো। কারণ তার স্ট্রাইক রেট কখনই আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেট সুলভ ছিল না। বিজয় নিজের জন্য খেলতেন বলেও অপবাদ শুনতে হয়েছিল।

ব্যাটিং নামার সময় হয়তো বিজয় স্ট্রাইক রেটের কথা মাথায় রেখেছিলেন। প্রথম ওয়ানডেতে টাইগার ব্যাটারদের মধ্যে সবার চেয়ে বেশি স্ট্রাইক রেট বিজয়েরই ছিল। ১১৭.৭৪ যা প্রায় ১১৮ এর কাছাকাছি। তামিম-লিটন দুজনের গড়ই ছিল ১০০ এর নিচে। তামিমের ৭০.৪৫ ও লিটনের ৯১.০১। মুশফিকু রহিমের ছিল ১০৬.১২। তবে ইনিংসের শেষ দিকে এসে ব্যাট করতে নামা মাহমুউল্লাহ রিয়াদের স্ট্রাইক রেট ছিল সবার চেয়ে বেশি। তিন বাউন্ডারির সাহায্যে ১২ বলে ২০ রান করা রিয়াদের স্ট্রাইক রেট ১৬৬.৬৬।

স্ট্রাইক রেটের কথা মাথায় রেখেই হয়তো খেলেছেন বিজয়। বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই রান তুলতে দেখা গেছে তাকে। ৪৭ বলে ছুয়েছিলেন ক্যারিয়ারের চতুর্থ অর্ধশতক। এরপর ধুন্ধুমার ব্যাট করতেই দেখা গেছে তাকে। পেয়ে যেতে পারতেন ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতকের দেখাও। তবে অভিষিক্ত ভিক্টর নিয়াউচি সে সম্ভাবনার পথ রোধ করেন। এই রান গড়ার পথে লিটন এবং মুশফিকের সঙ্গে গড়েছেন বড় দুটি জুটি।

তামিম ইকবালের বিদায়ের পর লিটনের সঙ্গে ৫২ রানের একটি জুটি গড়েছিলেন। এই জুটি হয়তো আরও লম্বা হতে পারত। যদি লিটন দাস রিটায়ার্ড হার্ট না হতেন। লিটনের চোটে মাঠে নামেন মুশফিক। দুজনের মিলে স্বাভাবিক রাখেন রানের চাকা। গড়েন ৯৬ রানের একটি জুটি। যে জুটি মনে করিয়ে দেয় দশ বছর আগের স্মৃতি।

খুলনায় ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষের ম্যাচ। শুরুতেই তামিম ও নাইম ইসলামকে হারিয়ে চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। তখনই দলের হাল ধরেছিলেন এ দুজন। ত্রাতা হয়ে যেন এসেছিলেন বিজয় ও মুশফিক। দুজনে মিলে গড়েছিলেন ১৭৪ রানের জুটি। বিজয় সেদিন পেয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতকের দেখা। তখনকার অধিনায়ক মুশফিকও আউট হয়েছিলেন ৭৯ রান করে। তবে আজ শুক্রবার তামিম-লিটনের দারুণ শুরুতে চাপমুক্ত হয়েই খেলেছেন তারা। বাংলাদেশও পেরিয়ে যায় তিনশোর ঘর। দশ বছর আগের সেই ম্যাচে ১৬০ রানের জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। বিজয় হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। আজও ম্যাচ জয়ের সুযোগ রয়েছে। ম্যাচসেরার সুযোগটা খেলা পরিচালকদের কাছেই। তবে বিজয়ের এ প্রত্যাবর্তনটা দারুণ।  

শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম ওপার বাংলার ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর একটা গানের লাইন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’।  আনামুল হক বিজয়ের একদিনের আন্তর্জাতিকে ফেরাটা যেন এই গানের মতোই। এখন ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেই হয়!