স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা | 1167861 | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ে ইসলামের বিধান আছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক বিধানও দিয়েছে ইসলাম। স্বাস্থ্য বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ নিয়ামত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও আল্লাহর দরবারে সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতেন।

মানুষের জীবনধারণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আল্লাহ তাআলা পানি-বাতাস, আলো-আঁধার, ফল-ফসল, গাছপালা, পশুপাখি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি ওই সত্তা যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই তোমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ’ আল্লাহ আরো বলেন, ‘তারা কি অনুধাবন করে না যে আমি রাত সৃষ্টি করেছি তাদের বিশ্রামের জন্য এবং দিবসকে করেছি আলোকময়?’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮৬)

তিনি আরো বলেন ‘আমি রাতকে করেছি আবরণ ও পর্দা এবং দিবসকে করেছি জীবিকা অর্জনকাল। ’ (সুরা : নাবা,  আয়াত : ৯-১০)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ঘুমের সময় মানুষের মস্তিষ্ক থেকে চোখ দিয়ে এক প্রকার বিষ নির্গত হয়। এই বিষ নিঃসরণের ফলে সারা দিনের ক্লান্তি ও অবসাদ দূরীভূত হয়ে যায়। যার ফলে ব্যক্তি ঘুম থেকে জেগে পূর্ণ উদ্যমে কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে।

মানবশিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকেই তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলাম প্রতিরোধব্যবস্থা প্রদান করেছে। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর দীর্ঘ দুই বছর একাদিক্রমে শিশুকে মায়ের দুধ পানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে, শিশুর জন্য সর্বাপেক্ষা বেশি পুষ্টিকর, রোগ প্রতিরোধমূলক ও আদর্শ খাবার হলো মাতৃদুগ্ধ। এতে শিশুর জন্য পরিমিত পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ, ভিটামিন ও শক্তি-সামর্থ্য বিদ্যমান। জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ ছাড়া বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। এ প্রসঙ্গে কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘আর মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যদি দুধ পান করানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

সুস্বাস্থ্যের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এ বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। আর ইসলামে এ বিষয়ে রয়েছে সুন্দর নির্দেশনা। মহানবী (সা) বলেছেন, ‘পবিত্রতা (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা) ঈমানের অর্ধেক। ’

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পূর্বে অন্তত পাঁচবার করে অজুর মাধ্যমে মুখ, নাক, হাত-পা পরিষ্কার করা অপরিহার্য করা হয়েছে। তা ছাড়া সব ইবাদতে অজুর বিধান থাকায় মুসলমানদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নামাজের পূর্বে মিসওয়াক করলে স্বাভাবিক মিসওয়াকবিহীন নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ সওয়াব পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নবীজি। তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে ঘুমের সময় মুখে জমে থাকা রোগজীবাণু দূরীভূত হয়। এতে বহুবিধ রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এভাবে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নাক পরিষ্কার করা, প্রস্রাব-পায়খানার পর টয়লেট পেপার ও পানি ব্যবহার করা, পরিমিত আহার, ধূমপান ও মাদক গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিধিমালার মাধ্যমে ইসলাম স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক অসাধারণ ব্যবস্থাপত্র জারি করেছে।

ইসলামের অন্যতম বিধান নামাজ। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের ওপর ফরজ। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করায় অনেক অসুখ-বিসুখ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজে শেফা ও আরোগ্য আছে। ’ আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, একবার পেটের ব্যথায় তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। তখন রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, দাঁড়াও এবং নামাজ আদায় করো। কেননা নামাজের মধ্যে রয়েছে রোগমুক্তি। (ইবনে মাজাহ)

বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. হাসান গজনবি বলেন, নামাজ আমাদের দৈহিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বড় ধরনের সাহায্য করে। এটা আমাদের দেহকে সক্রিয় রাখে, হজমে সাহায্য করে, আমাদেরকে জড়তা ও জোড়ার রোগ থেকে রক্ষা করে। নামাজ রক্ত পরিসঞ্চালনী ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটা হার্ট অ্যাটাক, প্যারালাইসিস, ডায়াবেটিস, মেলিটাস ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হার্টের রোগীদের প্রতিদিন বাধ্যতামূলক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা উচিত। যেভাবে তারা তাদের ডাক্তারদের নিকট খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অনুমতি লাভ করে থাকেন। (ইসলামিক মেডিসিন, পৃষ্ঠা ৬৮)

প্রখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ জাওয়াকিম ডি জুলদ বলেছেন, ‘যদি ইউরোপে নামাজের ব্যাপক প্রচলন হতো তবে আমাদের দৈহিক ব্যায়ামের জন্য নতুন নতুন ব্যায়াম ও অঙ্গসঞ্চালন পদ্ধতি আবিষ্কার করার প্রয়োজন হতো না। ’ তা ছাড়া রোগ নিরাময়েও নামাজের ভূমিকা সীমাহীন। মানসিক, স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক রোগ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, হার্ট ও জোড়ার রোগ, পাকস্থলীর আলসার, ডায়াবেটিস, চোখ ও গলা ইত্যাদির অনেক জটিল ও কঠিন রোগ নিয়মিত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে নিরাময় হয়ে থাকে। ’

ইসলামের আরেকটি বিধান হলো রোজা। কিডনি, আলসার, হজম ও হৃদরোগ উপশমে কার্যকর ভূমিকা পালন করে রোজা। মহান আল্লাহ এক মাস রোজা পালনের মধ্য দিয়ে বান্দার জন্য কেবল পরকালীন সাফল্যই নিশ্চিত করেননি, বরং তাদের সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতাসহ বহুবিধ উপকারের ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর রোজা পালন করা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৪)

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রফেসর মোরপান্ড বলেছেন, ‘ইসলাম যদি তার অনুসারীদের অন্য কোনো বিধান না দিয়ে শুধু রোজা দিত, তবু এর চেয়ে বিজ্ঞ নিয়ামত আর কিছু হতে পারত না। বিষয়টি নিয়ে আমি একটু গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মুসলমানদের নিয়মানুযায়ী রোজা পালন করতে শুরু করি। দীর্ঘদিন ধরে আমি পাকস্থলীর রোগে ভুগছিলাম। রোজা রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ সুস্থবোধ করতে শুরু করলাম। পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, রোগ অনেকটাই কমে গেছে। আমি রোজা চালিয়ে যেতে লাগলাম, এতে দেহে আরো কিছু পরিবর্তন দেখতে পেলাম। কিছুদিন পর দেখি, আমি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে গেছি। ’

রোগ নিরাময়ে মধুর ব্যবহার ইসলামে অনন্য একটি নিয়ামত হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তার পেট থেকে বিভিন্ন বর্ণের পানীয় নির্গত হয়, যাতে আছে মানুষের জন্য রোগের নিরাময়। নিশ্চয়ই এতে আছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন। ’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬৯)

আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে মধু অগণিত রোগের মহৌষধ। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, বাতের ব্যথা উপশম করে, শরীর ও ফুসফুসকে শক্তিশালী করে ও রুচি বৃদ্ধি করে। কাশি, হাঁপানি ও ঠাণ্ডা রোগীর জন্য মধু বিশেষ উপকারী। কালিজিরাকে ‘সর্বরোগের মহৌষধ’ বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কালিজিরার মধ্যে মৃত্যু ছাড়া সর্বরোগের চিকিৎসার উপকরণ আছে। ’

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলাতঙ্ক ও ক্যান্সারের মতো জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসায়ও এই কালিজিরা বিশেষ ফলদায়ক মহৌষধ।

এভাবে স্বাস্থ্যরক্ষা ও রোগ নিরাময়ে ইসলাম যে বিধান দিয়েছে, তা যুগান্তকারী, বিস্ময়কর, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসম্মত। ইসলামের বিধান পরিপালনের মাধ্যমে মানুষ সুস্থ জীবন লাভ করতে পারে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুস্থতার অমূল্য সম্পদ দান করুন। আমিন।