ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনুজীবের সংক্রমণকে ‘নীরব মহামারী’ উল্লেখ করে টিকার পরীক্ষাসহ বিদ্যমান টিকার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেসিস্টেন্স (এএমআর ) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণকে ইতোমধ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশ্বের শীর্ষ ১০ হুমকির একটি হিসেবে ঘোষণা করেছে সংস্থাটি।

এ ধরনের সংক্রমণ ঠেকাতে পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে থাকা টিকাগুলো নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো একটি প্রতিবেদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

মানুষ, পশু এবং গাছে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল সংক্রমণ ঠেকাতে ওষুধ হিসেবে ‘অ্যান্টিবায়োটিক’, ‘অ্যান্টিভাইরাল’, ‘অ্যান্টিফাঙ্গাল’ এবং ‘অ্যান্টিপ্যারাসাইট’ ব্যবহার করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবীকে যখন ওষুধ দিয়ে ঠেকানো যায় না এবং সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হয়ে ওঠে, রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিসহ গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যু বেড়ে যায় তখন এএমআর  সংক্রমণ ঘটে।

ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠায় অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ওষুধগুলো অকার্যকর হয়ে ওঠে এবং সংক্রমণ পরিস্থিত জটিল কিংবা চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে পড়ে।

সংস্থাটি জানায়, অপ্রতিরোধযোগ্য ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে প্রতি বছর প্রায় ৪৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্য হয়। এর মধ্যে ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর সরাসরি কারণ এএমআর।

এএমআর  সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এবং এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে টিকাদান একটি কার্যকর উপায় উল্লেখ করে সম্ভাব্য টিকা নিয়ে গবেষণা্ এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে।

সংস্থাটি এ ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ ঠেকাতে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা ৬১টি টিকা চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি টিকা তৈরির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে থাকা টিকাগুলো নিয়ে উচ্চ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হলেও তার বেশিরভাগই সহসা মিলবে না বলেও সতর্ক করা হয়।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেসিস্টেন্স নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহকারী মহাপরিচালক ড. হানান বালখি বলেন, “টিকা দেওয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকানো হলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমে আসবে, যেটা এএমআর  এর অন্যতম একটি কারণ।

“এএমআর এর কারণে মৃত্যুর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত শীর্ষ ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল প্যাথোজেন দায়ী, এর মধ্যে কেবলমাত্র নিউমোকোকাল রোগের জন্য টিকা রয়েছে।” 

তিনি বলেন, “নিউমোকোকাস এর বিরদ্ধে কাজ করে এমন টিকাসহ জীবন রক্ষায় সাশ্রয়ী এবং সবাই পেতে পারে এমন টিকা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন এবং এএমআর  এর ঊর্ধ্বগতি প্রশমিত করা দরকার।”   

প্রতিবেদনে বিদ্যমান টিকাগুলোর সমতা ভিত্তিক বৈশ্বিক প্রাপ্যতা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে সীমিত সম্পদ রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত চারটি রোগের টিকা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-নিউমোকোকাল রোগ (স্ট্রেপটোকোকাস নিউমোনিঅ্যা), হিব (হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি) টিউবারকোলোসিস (মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকোলোসিস) এবং টাইফয়েড জ্বর (সালমোনেল্লা টাইফি)।

সাধারণত যক্ষ্মার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন (বিসিজি) টিকা পর্যাপ্ত প্রতিরোধ দেয় না উল্লেখ করে আরও কার্যকর টিকা তৈরির গতি বাড়াতে বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। 

২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে সংস্থাটি যে সব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল, সেসবের প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দ্রুত বেড়েছে বলে জানানো হয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠায় ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনী নতুন চিকিৎসা অপ্রতুল বলেও ওই প্রতিবেদনে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

এসব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কম জানিয়ে সংস্থাটি শিগগিরই একটি বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধলে তার ওপর জোর দিয়েছে।  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এএমআর  গ্লোবার কোঅরডিনেশন ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ড.হ্যাইলেসাস গেটাহুন বলেন, “টিকার উন্নয়ন এবং পাইপালাইনে এর সংখ্যা বাড়াতে জোড়ালো পদক্ষেপ দরকার। কোভিড- ১৯ টিকার উন্নয়ন এবং এমআরএনএ  টিকাগুলো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে টিকা তৈরির চেষ্টায় অনন্য এক সুযোগ তৈরি করেছে।” 

প্রতিবেদনে টিকার উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয়েও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে সংক্রমণের (এইচএআই) জন্য দায়ী প্যাথোজেনও রয়েছে।

এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মাঝখান থেকে তাদের শনাক্ত করা এবং টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষার খরচ এবং জটিলতার বিষয়টিও রয়েছে। হাসপাতাল থেকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত ঘাটতির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমিউনাইজেশন, ভ্যাকসিনস অ্যান্ড বায়োলজিক্যালস ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ড. কেট ও’ব্রায়ান বলেন, টিকার উন্নয়ন ব্যয়বহুল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে চ্যালেঞ্জিং, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার হারও উঁচু এবং সফল হলেও জটিল নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে সময় বেশি লাগে।

“আমাদের কোভিড টিকার উন্নয়ন থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং এএমআর  ঠেকানোর মতো টিকা তৈরির জন্য অনুসন্ধান বাড়াতে হবে।”

এ বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪৮ জন, তাদের ২৭ জনেরই মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বরে
এএমআর বা এআরের কারণে অনেক ওষুধ অনেক অনুজীবের বিরুদ্ধে আর কার্যকর থাকে না, ফলে সেগুলোর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়।