নকআউটে কবে-কখন-কার খেলা? | স্পোর্টস | দেশ রূপান্তর

ব্রাজিলের বিপক্ষে ক্যামেরুনের অঘটন দিয়ে শেষ হয়েছে কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব। এ বার শুরু হতে চলেছে নকআউট পর্ব। এই পর্বে যে জিতবে সেই যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রতিদিন থাকছে দুটি করে খেলা। ষোলো দল খেলবে আটটি ম্যাচ। হারলেই নিশ্চিত হবে বিদায়। গ্রুপ এ, বি, সি, ডি, ই, এফ, জি ও এইচ গ্রুপ থেকে দু’টি করে দলে উঠেছে শেষ ষোলোয়। সেখানে কোন দল কার বিরুদ্ধে খেলবে? কবে, কখন হবে সেই খেলা?

কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করার পরই লিওনেল মেসি জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে আর দেখা যাবে না তাকে। তবে জাতীয় দলের হয়ে আরও কিছু দিন যে খেলবেন, সেটি এক রকম নিশ্চিত করেছিলেন। এরপরও সবার কৌতূহল, ২০২৬ বিশ্বকাপে সত্যিই কি দেখা যাবে না পিএসজি তারকাকে?

আর্জেন্টিনার ‘ওলে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মেসি। তার কথায় পরিস্কার, ফুটবল উপভোগ করলে এবং ফিট থাকলে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতেই পারেন তিনি।

মেসি বলেন, ‘আমি সব সময় বলেছি, বয়সের কারণে এই বিষয়টি (২০২৬ বিশ্বকাপ খেলা) কঠিন হবে। আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি, আমি যা করি ভালোবেসে করি। যতক্ষণ আমি ভালো বোধ করছি এবং ফিট আছি, আমি এটি উপভোগ করবো।’

‘কিন্তু নিজের শারীরিক অবস্থাও বুঝতে হবে আমাকে। আমি চাইব যেন আমি এটা উপভোগ করি। তবে কাজটা খুব কঠিন। বয়স ৩৬ হয়ে যাবে আমার, ক্যারিয়ার কোথায় যাচ্ছে সেটাও আমাকে দেখতে হবে।'

কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছর পর দেশকে শিরোপা এনে দেওয়ার পথে পুরো আসর জুড়ে দুর্দান্ত খেলেন মেসি। পান টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি।

ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন ভারতীয় ওপেনার শুভমান গিল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সদ্য শেষ হওয়া সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি উপহার দেন তিনি। তার আগে ওয়ানডে সিরিজে একটি করে ডাবল সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরি হাঁকান। সব মিলিয়ে গিলকে নিয়ে এখন জোর চর্চা নেট দুনিয়ায়।

আর এর মাঝেই এক ছবি ভাইরাল হয়েছে। যে ছবিতে পাশাপাশি-কাছাকাছি শুভমান গিল ও তার রিউমারড প্রেমিকা সারা আলি খান। শুভমানের সেঞ্চুরি হতেই কি তবে গোপনে আহমেদাবাদে পৌঁছে গেলেন সারা, প্রশ্ন সবার।

গত বুধবার রেকর্ড ১৬৮ রানের জয়ে মাত্র ৬৩ বলে ১২৬ রান করেছেন শুভমান। যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বিমানবন্দরে পাশাপাশি বসে আছেন শুভমান ও সারা। কথায় ব্যস্ত তারা।

সবার প্রশ্ন একটাই, ছবিটি কি সাম্প্রতিক? যখন নেটিজেনদের একটা বড় অংশের দাবি ছবিটি সাম্প্রতিকই তখন সারার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, এ ছবি আগের।

সারা এই মুহূর্তে মুম্বাইয়েই রয়েছেন। তাই আহমেদাবাদে তার ‘অভিসার’-এর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে শুভমানও আহমেদাবাদ থেকে ফেরার এক ছবি পোস্ট করেছেন। যে ছবিতে তার সঙ্গী সারা আলি খান নয়। রয়েছেন হার্দিক পান্ডিয়া ও নাতাশা স্তানকোভিচ।

কীভাবে সারা আলি খানের সঙ্গে নাম জড়াল শুভমানের? গত বছর আগস্ট মাসেই সারা ও শুভমনকে একসঙ্গে দেখা যায়। এক টিকটক ব্যবহারকারীর গোপন ভিডিও-তে ধরা পড়ে যায় তাদের ‘ডিনার ডেট’।

সবাই কার্যত চমকেই গিয়েছিলেন। কারণ এর আগে, শুভমনের সঙ্গে নাম জুড়েছিল শচীন টেন্ডুলকরের মেয়ে সারার। এমনকি সার্চ ইঞ্জিন গুগলে সারার ‘স্বামী’ বলে খুঁজলে আসত শুভমান গিলেরই নাম।

কিন্তু পরে সব হিসেব যেন গুলিয়ে যায় আচমকাই। এখানেই শেষ নয়, সোনম বাজওয়ার টক শো’তে হাজির হয়েছিলেন শুভমান। তাকে প্রশ্ন করা হয়, এই মুহূর্তে বলিউডে সবচেয়ে ফিট অভিনেত্রী কে? উত্তরে একমুহূর্ত চিন্তা না করেই শুভমান সারা আলি খানের নাম বলে দেন!

এরপরেই কোনো রাখঢাক না করেই সোনম শুভমানকে ছুড়ে দেন সেই প্রশ্ন। জিজ্ঞাসা করেই বসেন, ‘তুমি কি সারাকে ডেট করছ?’ উত্তরে শুভমান বলেন, ‘হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না’।

এর আগে সারার জীবনে কখনো এসেছেন সুশান্ত সিং রাজপুত আবার কখনো বা এসেছেন কার্ত্তিক আরিয়ান। এবার কি শুভমন?

শঙ্কাটাই সত্যি হলো। লিগ ওয়ানে মঁপেলিয়ের বিপক্ষে পাওয়া চোটে তিন সপ্তাহের জন্য ছিটকে গেলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফলে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগের ম্যাচটি খেলা হবে না তার।

মঁপেলিয়ের মাঠে বুধবার রাতে ৩-১ গোলে জিতে পিএসজি। ম্যাচটা একেবারেই ভালো কাটেনি এমবাপ্পের। চোট নিয়ে ২১ মিনিটের মাথায় মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। এর আগে দুইবারের চেষ্টায় স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি।

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বায়ার্নকে আতিথ্য দেবে পিএসজি। দ্বিতীয় লেগের ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ৮ মার্চ।

এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি ফ্রেঞ্চ কাপে মার্শেই ও এর তিন দিন পর লিগ ওয়ানে মোনাকোর বিপক্ষে খেলবে পিএসজি। এই দুটি ম্যাচেও এমবাপ্পেকে পাবে না দলটি।

কাতার বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের উন্মাদনার গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। টুর্নামেন্ট চলাকালে এ নিয়ে কথা বলেছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। বিশ্বকাপ জয়ের দেড় মাস পর মুখ খুললেন দলটির অধিনায়ক লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনার ‘ওলে’ পত্রিকাকে বিশ্বকাপ জয় নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মেসি। সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।

মেসি বলেন, ‘হ্যাঁ আমি দেখেছি (বিশ্বকাপে বাংলাদেশের মানুষদের সমর্থন)। সব জায়গায় ১০ নম্বর জার্সি, বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সোফি মার্তিনেজ (আর্জেন্টাইন সাংবাদিক) আমাকে দেখিয়েছিল। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি এভাবে পৃথিবীর নানা প্রান্তে দেখা, সত্যিই দুর্দান্ত।’

বিশ্বকাপ চলাকালীন স্কালোনি বাংলাদেশকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রথমে ডিয়েগো (ম্যারাডোনা), পরে মেসির কারণে আর্জেন্টিনার ফুটবলের সমর্থক বেড়েছে। বাংলাদেশে আমাদের এমন সমর্থন আছে জেনে আমি গর্বিত। শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্য অনেক দেশের মানুষও আমাদের সমর্থন করে।’

বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের উন্মাদনার গল্প বিশ্ব মিডিয়ায় বেশ ফলাও করে ছাপা হয়। ব্যাপারটিতে আর্জেন্টাইনরা এতটা আপ্লুত ছিল যে, তারা বুয়েনস এইরেসেও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছেন।

ঘরের মাঠে সিলেট স্ট্রাইকার্সের শেষ ম্যাচে বল করতে গিয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। এরপর আর মাঠে দেখা যায়নি তাকে। গুঞ্জন চলছিল পরের ম্যাচেও পাওয়া যাবে না তাকে।

মিরপুরের একাডেমি মাঠে বৃহস্পতিবার দলীয় অনুশীলন শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন সিলেট স্ট্রাইকার্সের কোচ রাজিন সালেহ। সেখানে এই প্রধান কোচের কাছে মাশরাফীর ইনজুরি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, রাতে জানা যাবে পরবর্তী ম্যাচে তিনি খেলবেন কি না।

রাজিন সালেহ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আসলে আমরা বলতে পারছি না কারণ আজকে রাতে আমরা আপডেটটা জানতে পারবো। ফিজিওর সঙ্গে বসবো একটা মিটিং আছে। তারপর বুঝতে পারবো ম্যাচ খেলতে পারবে কি না।’

প্লে অফ নিশ্চিত। এখন কি কোনো ক্রিকেটারকে বিশ্রাম দেওয়ার চিন্তা রয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজিন বলেন, ‘দেখুন এখানে থামার কোনো সুযোগ নেই, বা বিশ্রামের কোনো সুযোগ নেই। আমরা একটা একটা করে ম্যাচ এগিয়েছি এবং এখনো একটা একটা করেই এগিয়ে যাবো।’

পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা চলে গেছে কি না জানতে চাওয়া হলে সিলেটের প্রধান এই কোচ বলেন, ‘হ্যাঁ আমাদের আমির এবং ইমাদ ওয়াসিম চলে গেছে। তবে মোহাম্মদ ইরফান টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত থাকবে। গুলবাদিন নাইবও থাকবে। ইরফান পিএসএলে নয়, এখানেই খেলবে বলে আমি জানি। সে আগেও সিলেট সিলেট সিক্সার্সের হয়ে খেলে গেছে।’

শাহজালাল বিমানবন্দরের এই প্রবেশ পথটি এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না। তাই বিজনেস ক্লাসের যাত্রীদের ঢোকার পথের পাশের পথটিতে ভিড়বাট্টাও কম। ফ্রস্টেড পেপার (ঘোলা কাগজ) দিয়ে সেই প্রবেশ পথের দরজার গ্লাস ঢাকা। ব্যবহারে ব্যবহারে পেপারের একটা কোনা উঠে গেছে। সেই কোনায় এক চোখে অপলক তাকিয়ে আছেন মা। যদি ছেলে বখতিয়ারকে একনজর দেখা যায়, সেই আশায়।

ছেলের এ বিদায় কি শুধু বিষাদময়, আনন্দের নয়? এ বিদায়ে কি শুরু হবে না নবতর যাত্রা? বিদায়ের বিষাদের আড়ালে উন্নত জীবনের হাতছানি কতটা দোলায়িত করে মন? পুরোটাই কি অনিশ্চয়তার ভয়, নীড়হারা পাখির ঘোরাফেরা? নাকি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দৃঢ় পদক্ষেপ?

সব বিদায় প্রকাশ্য নয়। মনের গহিনে করে একজনকে বয়ে নিয়ে যান অভিবাসী। তার শার্টের ইয়োকে কারও চোখের কাজলধোয়া পানি।

শুধু শ্রমিকরাই দিবারাত্রির বিরামহীন এ যাত্রার সঙ্গী নয়। শিক্ষা শেষে সফল প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষার শুরুও এখানেই। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ফেরার অপেক্ষার ইনিংসও শুরু হয় এখানে। প্রিয়জনকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট মাটিচাপা দিয়ে অজানা বাহনে চেপে বসা।

বিদায় নানারকম। স্বল্পকালীন এ বিদায় ছাড়াও বিমানবন্দরেই আছে চিরকালীন বিদায়। ফিরে আসার কথা থাকলেও ফেরেন কাঠের বাক্সে। এ জন্যই বিমানবন্দরের বিদায় এত বিষাদময়। সবারই মনের গহিনে লুকিয়ে থাকে, ‘আবার হবে তো দেখা?’

ততক্ষণে বখতিয়ার বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশনের পথে পা বাড়িয়েছেন। ভয়ার্ত চোখে ইতিউতি তাকাচ্ছেন। অজানা গন্তব্যে পাড়ি দেওয়ার পথে শঙ্কা তার প্রতিটি পদক্ষেপে। চারদিকের চেঁচামেচি তাকে স্পর্শ করছে না। বখতিয়ারের পা চলছে না। যন্ত্রের মতো এগিয়ে গিয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে তুলে দিলেন পাসপোর্টসমেত এক পোঁটলা কাগজপত্র। যেন কাগজপত্রের সঙ্গে তিনি নিজেকেও সঁপে দিলেন পুলিশের কাছে।

কাগজপত্র দেখে পুলিশই ঠেলতে ঠেলতে তাকে পাঠিয়ে দিল প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জে। নানা দেশের যাত্রীরা বসে আছেন রঙবেরঙের চেয়ারে। সবাই গল্পগুজবে মেতে উঠেছেন। কিন্তু বখতিয়ার এক কোনায় বসে আছেন পাথরের মতো। তিনি সৌদি আরবে যাবেন মাজরা ভিসায়।

গত ২০ জানুয়ারি এয়ারপোর্টের প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জে বসে বখতিয়ারের কাছে জানতে চাই মাজরা ভিসা কী? বখতিয়ার জানান, ক্ষেত-খামারে কাজ করার ভিসা।

দেশে কী করতেন প্রশ্নের জবাবে জানান, প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। মাসে বেতন ৬ হাজার টাকা। ওভারটাইম মিলে টেনেটুনে ৯ হাজার পর্যন্ত ওঠে। এ দিয়ে কোনোরকমে চলে যায়। ভবিষ্যতের চিন্তায় বিদেশ যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। জীবনে একা কখনো ঢাকা আসেননি। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে মা সবসময় কাউকে না কাউকে সঙ্গে পাঠাতেন। বিদেশের টাকা জমা দেওয়ার পর একবার মেডিকেল চেকআপ আর আরেকবার টিকিট নিতে ঢাকা এসেছিলেন। দুবারই এলাকার বড় ভাই সঙ্গে ছিলেন।

আপনার মা বাইরে থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে আপনাকে দেখছিলেন। আপনি তার দিকে ফিরে তাকাননি জানানোর পর বখতিয়ার বলেন, মা কোন দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন আমি টের পাইনি। টের পেলে... কথা শেষ করতে পারেননি। গলাটা ভারী হয়ে গেল, চোখটাও ঝাপসা।

বখতিয়ারের জবানিতেই স্পষ্ট প্রিয়জন ছেড়ে বিদেশ-বিভূঁইয়ে যাত্রা অবশ্যই আনন্দের। বখতিয়ার বলেন, আমি যদি জায়গামতো পৌঁছাতে পারি তাহলে এ বিদায় আনন্দের। আমার দুঃখিনী মাকে আর কষ্ট করতে দেব না। ছোট বোনটার মাথা খুব পরিষ্কার, তাকে লেখাপড়া শেখাব।

আপনি তো কিছুই চেনেন না। সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে যাবেন কীভাবে বখতিয়ারের চটপট জবাব, কেন দেখেননি আমার মাথায় একটা ক্যাপ আছে। সেই ক্যাপ দেখে কোম্পানির লোক আমাকে খুঁজে নেবে এয়ারপোর্ট থেকেই।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বখতিয়ার স্বাভাবিক হলেন। আরও গল্পের ইচ্ছা থাকার পরও তাকে উঠতে হলো সিকিউরিটি চেকআপের জন্য। এয়ারলাইনসের লোকদের হাঁকডাকে বখতিয়ার উঠে গেলেন।

প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জ ছাড়ার আগে বলে গেলেন, বের হওয়ার পর আমার মাকে পেলে বলবেন আর যেন না কাঁদে। এই বলে তিনিও চোখ মুছতে লাগলেন।

নানাজনের সঙ্গে কথা বলে কখন যে দুই-তিন ঘণ্টা কেটে যায় বোঝা যায়নি। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার ফটক পার হতে গিয়েই দেখা মেলে বখতিয়ারের মায়ের সঙ্গে। তখনো তিনি বিমানবন্দর ছাড়েননি। বিকট শব্দ করে উড়োজাহাজ চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।

অ্যাসাইনমেন্ট পুরোপুরিভাবে কাভার করার জন্য বখতিয়ারের মায়ের নামটি দরকার ছিল। কিন্তু সাহস হয়নি জিজ্ঞেস করার। কী হবে এ মায়ের নাম জিজ্ঞেস করে? বাংলাদেশের সব মা-ই তো বখতিয়ারের মায়ের মতো।

ঘরকুনো হিসেবেই বাঙালির পরিচয় ছিল। কিন্তু আজ যখন কোটিখানেক লোক বিদেশ-বিভূঁইয়ে কাজের সূত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, তখন সেই পরিচয় আর খাটে না। দেশের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে তারা হরদম বিদেশ যাচ্ছেন-আসছেন। বিদেশযাত্রা ডালভাত হয়ে গেলেও বিমানবন্দরে তারা আটকা পড়েন আবেগের বেগে।

বখতিয়ার চলে যাওয়ার পর তার চেয়ারেই বসলেন ফয়সাল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। সামনে হটডগ জাতীয় কোনো ফাস্টফুড। কোথায় যাচ্ছেন জানতে চাইলে বেশ চটপটে জবাব দিলেন দুবাই।

ফয়সাল জানান, তার জড়তা নেই, কিন্তু কষ্ট আছে। সেই কষ্ট তিনি কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারছেন না। তার বাবা-মাও তাকে বিদায় দিতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু একজন উপস্থিত না হয়েও উপস্থিত হয়েছেন। তিনি হচ্ছেন তার প্রেয়সী। চেয়েছিলেন তাকে বিয়ে করে দুবাই ফিরে যাবেন। কিন্তু বাবা-মায়ের করোরই মত নেই। তাদের পছন্দ অন্য মেয়েকে।

জানতে চাইলাম প্রেয়সী কীভাবে বিদায় দিলেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তেত্রিশ বছর কেটে গেল’র বরুনার মতো, সুগন্ধি রুমাল দিয়ে?

না, জবাব দেন ফয়সাল। তার কাজলধোয়া চোখের পানি আমার শার্টের ইয়োকে, আস্তিনে লেগে আছে। আমি তা বহন করে নিয়ে যাচ্ছি।

কারও সঙ্গে আলাপ জুড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম সেরা জায়গা হতে পারে প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জ। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে ইমিগ্রেশন পাড়ি দিয়ে অনেকে সেখানে পৌঁছে যান ফ্লাইট ছাড়ার তিন ঘণ্টা আগে। হাতে থাকা বিস্তর সময় শেষ হয় না ফোনে। এমনই এক অলস সময়ে প্যাসেঞ্জারস লাউঞ্জে বসে চ্যাট করছিলেন তাহরিম ইমতিয়াজ। লন্ডনে যাচ্ছেন বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে। আগে কোনো দিন বিদেশ যাননি, দেশেও উড়োজাহাজের দরজা মাড়াননি। সেই যুবক চলে যাচ্ছেন লন্ডনে।

অর্থনৈতিক সংকটের এ সময় স্টুডেন্ট প্রোফাইল খোলা, পাউন্ড সংগ্রহ করতে ঝামেলা হয়নি তো জানতে চাইলে স্মার্ট উত্তর তাহরিমের। আলাপে আলাপে তিনি জানান তিন বছরের ভিসা। তিন বছরই থাকবেন। এরপর দেশে ফিরে আসার প্রত্যয়।

বেশিরভাগই তো দেশে ফেরে না। এক দেশে না হলে ইউরোপের অন্য দেশে চলে যায়, স্থায়ী বসতি গড়ে।

না না না, তা হবে না। দেশে ফিরবই। এই পথচ্যুত রাজনীতিই আমার দেশ, বিশে^র বায়ুদূষণের শীর্ষে থাকা ঢাকাই আমার নগরী এগুলো ঠিক করতে হবে না। দৃঢ়তার সঙ্গে জানান তাহরিম ইমতিয়াজ।

বিমানবন্দরের দোতলায় বিদায়ের ঘনঘটা, ঠিক তার নিচতলায়ই মিলনমেলা। কারও সন্তান ফিরছে, কারও মা, কারও ভাই বা নিকটাত্মীয়। দেখামাত্রই আনন্দের হুল্লোড় শুরু হয়। তবে এ হল্লা নিথর হয়ে যায় পাশের কার্গো কমপ্লেক্সের গেটে। গেট দিয়ে কাঠের কফিন বের হলেই কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শোকের পাহাড় সঙ্গে নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এগিয়ে যায়।

স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মুসাব্বিরের জামিনের কাগজপত্র নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলে কারাফটকে আসেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে কারাফটক থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ একটি সাদা মাইক্রোবাসে তাকে তুলে নিয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরের কাছে এ অভিযোগ করেন মুসাব্বিরের পরিবারের সদস্যরা।

তারা বলেন, সাদা পোশাকের পুলিশের সঙ্গে তেজগাঁও থানা পুলিশও ছিল বলে জানতে পেরেছি। রাতে স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মুক্তি পাওয়ার পরও কারাফটক থেকে মুসাব্বিরকে সাদা পোশাকের পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অবিলম্বে মুসাব্বিরের মুক্তির দাবি জানান।

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনকালীন সরকারের সময় অনেক ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকলেও বদলি/পদায়নের নির্দেশ বাস্তবায়নে ধীরগতি অনুসরণ করা হয়। ফলে বদলি/পদায়ন যখন নির্দেশ দেওয়া হবে কার্যকরও তখন থেকেই চায় কমিশন। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়বে না। অর্থাৎ বদলি/পদায়নের ক্ষমতা ইসির হাতে চায় কমিশন। এ জন্য সংবিধানের ১২৬ ধারার আলোকে একটি বিধি করার প্রয়েজনীয়তা মনে করছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠান।

এদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলতি বছর ২৪ ডিসেম্বর করতে চায় নির্বাচন কমিশন। একটি ঘরোয়া আলোচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমন ইচ্ছার কথা বলেছেন, এমন তথ্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে সরকারি দলের একটি সূত্র যার সঙ্গে কমিশনের কাজের সম্পর্ক রয়েছে।

বিধি প্রণয়নের প্রাথমিক কাজ শুরু : সংবিধানের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ এ ধারায় পুরোপুরি ক্ষমতা প্রয়োগে কিছুটা দুর্বলতা দেখছে কমিশন। তাই বিধি করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ধরনের বিধির ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আলোচনা করে ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। কমিশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বিধি করার পক্ষে না। ইলেকশন কমিশনকে সব ধরনের ক্ষমতা দেওয়াই আছে। এখন সেই অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে না পারলে বিধি করেও পারবে না। যদি তাদের আদেশ কেউ পালন না করে তাদের উচিত হবে নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়া। এমন দু-একটি নজির স্থাপন করতে পারলে সবাই সবকিছু মানবে। এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে না যাওয়াই ভালো। এমন কিছু হলে... দেখা যাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিধি চাইলে নির্বাচন কমিশন করতে পারে। আমার প্রশ্ন হলো বিধি করার প্রয়োজন কোথায়। সংবিধান কমিশনকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। সেটাই যথেষ্ট মনে করি আমি। ভোটের সময় ইসির কোনো নির্দেশ পালন না হলে সেখানে নির্বাচন বন্ধ করে দেবে তারা। তাহলেই সবাই সবকিছু মানবে। এখানে বিধি কেন? এখনকার ক্ষমতার বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে বিধি করেও বাস্তবায়ন করা যাবে না। সিইসিকে আইন বোঝানোর দরকার নেই, তিনি এগুলো সব বোঝেন।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনে বিধিবিধান হয়েছে। হয়, হচ্ছে ও ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিধি/বিধান প্রণয়ন অগণতান্ত্রিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও।’

কমিশন সূত্র জানায়, নির্বাচনের সময় বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বদলি/পদায়ন এসব তাৎক্ষণিকভাবে করার প্রয়োজনীয়তা থাকে। নির্বাচনকালে এ ধরনের কোনো আদেশ করা হলে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। তাই এ ধরনের আদেশ যাতে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন করা যায়, তাই এ ধরনের বিধি করে ক্ষমতা কমিশনের কাছে রাখার ব্যাপারে সরকারের কাছে পরামর্শ রাখবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গাইবান্ধাসহ একাধিক উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়েছে। করতে হয়েছে সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি নির্বাচন। এসব নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা ও সৃষ্ট জটিলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিশন নির্বাচনকালীন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে এ ধরনের একটি বিধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

কমিশনের ওই সূত্র আরও দাবি করে, সম্প্রতি কিছু আইনি জটিলতা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যোগাযোগ করা হয়। তাতে কাক্সিক্ষত ও দ্রুত সময়ে সুফল আশা করলেও নির্বাচন কমিশন তা পায়নি। এ বিষয়টিও বিধি প্রণয়নে কমিশনকে উৎসাহিত করেছে।

নির্বাচন কমিশনের অন্য একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান ও বর্তমান আইন অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নির্বাহী কোনো ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে না। নির্বাচনকালীন সরকার শুধু রুটিন কাজ করবে। সব ক্ষমতা কমিশনের কাছে ন্যস্ত থাকে। নির্বাচন কমিশন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার পায় না। পুলিশের একজন ওসি বা পুলিশ সুপারকে (এসপি) বদল করতে নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিলেও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাতে ভাবমূর্তি নষ্ট হয় কমিশনের। তাই ভাবমূর্তির প্রশ্নেও কমিশন বিধি করে নিতে উৎসাহিত বোধ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংবিধানের ১২৬ ধারার আলোকে বিধি করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ইসির হাতে নিতে পর্যালোচনা ও প্রস্তাব প্রায় ঠিক করে ফেলেছে কমিশন। বাকিটুকু সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করার অপেক্ষা। তবে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক আলোচনারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা উপনির্বাচন থেকে এ ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত। পরবর্তী সময় এ ভুল বোঝাবুঝি কমানো সম্ভব হয়নি। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্ক থাকা ওই নেতা আরও বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে ২০২৪ সালে নির্বাচন হবে বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে সেটিও ভুল বোঝাবুঝির আরেকটা কারণ। কমিশন দাবি করে, নির্বাচন কখন কবে হবে সেটা ঘোষণা করার এখতিয়ার কমিশনের। তাই সরকারি দলের বক্তব্য কমিশনকে বিব্রত করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের ওই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি সমাধান ভীষণ জরুরি। তা না হলে অনভিপ্রেত এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। নির্বাচন কমিশনের আলাদা বিধি করার প্রয়োজনীয়তা দেখছে না তারা। আওয়ামী লীগের ওই নেতারা আরও বলেন, সংবিধানের ১২৬ ধারায় নির্বাহী সব ক্ষমতা ইসির হাতে দেওয়াই আছে। ত্বরিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আলাদা বিধিবিধানের প্রয়োজন নেই। ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতারা আরও বলেন, নির্বাচন তাদের খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরুক। তখন ভালোমন্দ বুঝে সরাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

নির্বাচন ২৪ ডিসম্বের করার ভাবনা : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন করবে এ নিয়ে ভিন্ন ভাবনা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের শেষের দিকে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হতে পারে এমন সম্ভাব্যতার কথা জানিয়ে আসছেন বারবার। জোড় সালে নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য সুফল এনে দেয় এমন একটি ‘মিথ’ রয়েছে। সে কারণে আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন হবে ধরে নিয়ে তিনি এমন কথা বলছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে জোড় সালে অনুষ্ঠিত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগ একাদশ সংসদের অধিবেশন একটু দেরিতে ৩০ জানুয়ারি শুরু করেছিল। অর্থাৎ ২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ রয়েছে।

কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই নির্বাচন করার ব্যাপারে আগ্রহী। কমিশন ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন হবে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল গত মঙ্গলবার একটি ঘরোয়া আলোচনায় বলেছেন, চলতি বছর ২৪ ডিসেম্বর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করার কথা ভাবছে কমিশন। ওই আলোচনায় কমিশনের আরেক কর্মকর্তা অনেকটা মজার ছলে বলেছেন তাহলেও হবে, চব্বিশ তো থাকবেই। সরকার জাতীয় নির্বাচন চায় ২০২৪ সালে। কমিশন ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন করতে আগ্রহী। সেই চব্বিশই থাকল।

মনোমালিন্যের জেরে বিচ্ছেদ হয় তাদের। পরে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের একটি মামলাও করেছিলেন স্ত্রী। সেই মামলার শুনানী চলাকালে তাদের একমাত্র শিশু সন্তানের কান্নায় চোখ আটকে যায় আদালত কক্ষের বিচারকসহ উপস্থিত সবার। শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেন বিচারক নিজেই। আদালতের একটি মানবিক উদ্যোগের পর ভেঙে যাওয়া সংসার আবার জোড়া লাগে। আদালত কক্ষেই তাদের বিয়ের আয়োজন হয়। বৃহস্পতিবার রাজশাহী মেট্রপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে-২ এই ঘটনা ঘটেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে কর্মচারী শিমুল পারভেজের সঙ্গে ২০২১ সালের ২ এপ্রিল জান্নাত ফেরদৌসের বিয়ে হয়। তাদের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার কাঁটাখালি এলাকায়। তবে নিজেদের মধ্যে মনোমালিণ্যের জেরে গত বছরের অক্টোবর সংসার ভেঙে যায়। গত ১২ অক্টোবর শিমুলের বিরুদ্ধে জান্নাত ফেরদৌস আদালতে মামলা করেন।

বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামানের আদালতে সে মামলার জামিন শুনানি চলছিল। সাক্ষীর কাঠগড়ায় মামলার বাদী জান্নাত ফেরদৌসের কোলে তার ৬ মাসের শিশু কাঁদছিল। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২২/২৩ বছর বয়সী শিমুল। আদালতে জান্নাতের বাবা-মা এবং শিমুলের বাবা উপস্থিত ছিলেন। শুনানিকালে সন্তানের কান্নায় জান্নাতের চোখেও গড়িয়ে পড়ছিল পানি। মাথা নিচু করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শিমুল। দুই পক্ষের আইনজীবী পক্ষে-বিপক্ষে তাদের বক্তব্য রাখছিলেন। তখন আদালতের দৃষ্টি পড়ে ছোট্ট শিশুটির ওপর। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামানের চোখ এড়ায়নি ছোট্ট শিশুকে কোলে জান্নাতের কান্নাও। আদালত তাদের কাছে জানতে চান শিশুটির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বাদী ও আসামি আপস করতে চান কি না।

তখন জান্নাত ও শিমুল পরস্পরের বিপক্ষে অভিযোগ জানাতে শুরু করেন। কিছু দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করেন দুজনই। এসময় আদালত তাদের উদ্দেশে কিছু উপদেশমূলক কথা বলেন। তাদের ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যতের কথাও বলেন। একপর্যায়ে তারা দুজনই আপসে রাজি হন। এজন্য আদালতের মধ্যস্থতা চান। এ সময় দুপক্ষের আইনজীবীর অনুরোধে আদালত তার বিচার কার্য শেষে আদালত কক্ষেই উভয় পক্ষের আইনজীবী, অভিভাবকগণ ও বার সমিতির নেতাদের উপস্থিতিতে কাজী ডাকেন।

আদালতের ভেতরেই ১ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক পুনরায় তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। আদালত সবাইকে মিষ্টিমুখ করান।

পরে আদালতের বিচারক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামান স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই তার খাস কামরায় ডেকে নিয়ে সুন্দর করে সংসার করার উপদেশ দেন। তিনি শিশুটিকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ আদর করেন।

আদালতের এ মানবিক উদ্যোগে বাদী, আসামি আইনজীবী, আদালতের পেশকার, পিয়ন ও ম্যাজিস্ট্রেট সবার চোখেই তখন আনন্দ অশ্রু দেখা যায়।

বাদীপক্ষের আইনজীবী রেবেকা সুলতানা বলেন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজ্জামান অত্র আদালতে যোগদানের পর তিনি বিভিন্ন মামলায় তার মানবিক আচরণ এবং সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে তার আন্তরিক মধ্যস্থতায় অনেক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে যাচ্ছেন এবং মানবিক বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছেন। তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় আদালত কক্ষে এ ব্যতিক্রমী বিয়ের আয়োজনের মাধ্যমে একটি সংসার জোড়া লাগল।

কক্সবাজার শহরের একটি ভাড়া বাসা থেকে নিশাত আহমেদ (২৫) নামের এক নারী এনজিও কর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম বাহারছড়া এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহত নিশাত শহরের পশ্চিম বাহারছড়া এলাকার গফুর সওদাগরের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি চকরিয়ার ডুলাহাজারায়। তিনি আন্তর্জাতিক একটি এনজিও সংস্থায় সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বাড়ির মালিক গফুর সওদাগর বলেন, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে আমার মেয়েরা বাসার দ্বিতীয় তলায় নিশাতের রুমের দিকে যায়। বরাবরের মতোই তার রুমের দরজা ভিড়ানো ছিল। ধাক্কা দিতেই খুলে যায়। এ সময় মেয়েরা তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পায়। তারপর ৯৯৯ নম্বরে কল করা হয়।

শ্রম পরিদর্শক পদে যোগ দেওয়ার ৩৪ বছর পর পদোন্নতি পেলেন মাহমুদুল হক। স্বপ্ন দেখতেন পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে একসময় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে যাবেন। সেই স্বপ্ন আট বছরেই লুটিয়ে পড়ল জ্যেষ্ঠতার তালিকায়।

১৯৮৮ সালে যোগ দেওয়ায় ’৯৫ সালেই পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল মাহমুদুল হকের। কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অদূরদর্শিতা সে স্বপ্ন শুরুতেই বাধা পেল। এন্ট্রি পোস্টে যোগ দেওয়ার পর তার মতো অন্য কর্মচারীরা যখন পদোন্নতির স্বপ্নে বিভোর, তখন তাতে গা-ই করলেন না সেই সময়ের প্রতিষ্ঠানপ্রধান।

মাহমুদুল অপেক্ষায় রইলেন পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য। সেই পরিবর্তন আসতে আসতে চাকরিতে কেটে গেল আঠারো বছর। আঠারোতে মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তিনিও ভাবলেন আঠারোতে তিনি না হয় ‘জব ম্যাচিউরিটি’তে পৌঁছালেন। চাকরির আঠারো বছরে পদোন্নতি পেলেও মন্দ হয় না।

কিন্তু অবাক ব্যাপার, কর্তৃপক্ষ পদোন্নতি দিল, তবে মাহমুদুলকে ছাড়া। পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনে কোথাও তার নাম নেই। হতাশায় মুষড়ে পড়লেন তিনি। জুনিয়র কর্মকর্তারদের নাম আছে, অথচ তার নাম নেই। প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারকদের দরজায় দরজায় ঘুরলেন ন্যায়বিচারের আশায়। কিন্তু তারা পাত্তাই দিলেন না বিষয়টি।

তারা আমলে না নিলেও মাহমুদুলের স্বপ্ন তো সেখানেই থেমে যাওয়ার নয়। সেই স্বপ্ন পুঁজি করে তিনি গেলেন আদালতে। সেই ভিন্ন জগৎটাও কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তার পক্ষে রায় দিল। মাহমুদুল আনন্দে আত্মহারা হলেন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হলো না। সরকার আপিল করল প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে। মামলার ফল উল্টে গেল। হতাশায় ভেঙে না পড়ে তিনি গেলেন উচ্চ আদালতে। আপিল বিভাগে সিভিল আপিল মামলা করলে প্রশাসনিক আপিল আদালতের রায় বাতিল হয়। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকে।

জলে নেমে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করার মতো মাহমুদুল হকও যেন সরকারের সঙ্গে লড়াই করতে নামলেন। আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন করল সরকারপক্ষ। একপর্যায়ে সরকার বুঝতে পারল কোনোভাবেই তারা এ মামলায় জিততে পারবে না। সরকারপক্ষে রিভিউ পিটিশন প্রত্যাহার করা হলো। আদালত সরকারের পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনকে আইনের কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে ঘোষণা করল। জুনিয়র কর্মকর্তাকে যেদিন থেকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং যতবার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, একইভাবে মাহমুদুল হককে পদোন্নতি দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। বকেয়া বেতন-ভাতাসহ সব পাওনা কড়ায়-গ-ায় পরিশোধের নির্দেশনা আসে।

আদালতের এই নির্দেশনা দেওয়া হয় ২০১৮ সালে। এরপর আদেশ বাস্তবায়ন করতে সরকারের লেগে যায় প্রায় চার বছর। ২০২২ সালের ১১ মে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ৩৪ বছর পর পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মাহমুদুল হক। আবারও তাকে ঠকিয়েছে সরকার। জুনিয়র কর্মকর্তা যুগ্ম মহাপরিদর্শক হলেও তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয় তার দুই ধাপ নিচের সহকারী মহাপরিদর্শক পদে। উপমহাপরিদর্শক ও যুগ্ম মহাপরিদর্শক আরও ওপরের পদ। আদালতের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

কখনোই প্রজ্ঞাপন মাহমুদুল হকের জন্য ভালো বার্তা বয়ে আনেনি। পুরো চাকরিজীবন আদালতের বারান্দায় ঘুরে তিনি পৌঁছেছেন অবসরের প্রান্তসীমায়। আর তিন মাস পরে তিনি অবসরে যাবেন। যৌবন ও মধ্য বয়সের দিনগুলোতে আদালতে ঘুরে বেড়ানোর শক্তি ও সাহস থাকলেও মাহমুদুল হক এখন সেই সাহস দেখাতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করছেন। পারবেন তো শেষ সময়ে এসে সরকারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে?

মাহমুদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তিনি আদালতের কাছেই জানতে চাইবেন, আদালতের বিচার না মানার শাস্তি কী।

পুরো ঘটনা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা শুনিয়ে জানতে চাইলেন, কতজনের পক্ষে মাহমুদুল হকের মতো লড়াকু মনোভাব দেখানো সম্ভব?

বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের উপনির্বাচনে বেসরকারিভাবে ১১২ কেন্দ্রের ফলাফলে ৯৫১ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন বহুল আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলম। একতারা প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৮৬ ভোট। এ আসনে জয় পেয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (ইনু) সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম তানসেন। মশাল প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ২০ হাজার ৪৩৭ ভোট।

বুধবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে বগুড়ার দুইটিসহ মোট ৬ আসনে উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপির এমপিরা পদত্যাগের ঘোষণা দিলে এ আসনগুলো শূন্য হয়।

তখন, বগুড়া-৬ (সদর) এবং বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন হিরো আলম। নির্বাচন কমিশন একদফা তার প্রার্থিতা বাতিল করলেও পরে আদালতে গিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পান তিনি।

নাগরিকত্ব বিষয়ক জটিলতার জেরে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ ও পার্লামেন্টে আসন হারিয়েছেন নেপালের উপপ্রধানমন্ত্রী রবি লামিছানে। শুক্রবারের রায়ে আদালত জানিয়েছে, এই মুহূর্তে নেপালের নাগরিকত্বও নেই তার।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র বিমল পৌদেল বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ সম্পর্কে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায় অনুযায়ী, ২০২২ সালের জাতীয় নির্বাচনে নাগরিকত্ব বিষয়ক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে রবি লামিছানের বিরুদ্ধে। এ কারণে এখন থেকে আর পার্লামেন্টের সদস্য নন তিনি।’

নেপালের এক সময়ের জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব রবি লামিছানে দেশটির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্ট পার্টির শীর্ষ নেতা। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর নেপালের পার্লামেন্ট প্রতিনিধিসভার নির্বাচনে তার দল ২০টি আসনে জয়ী হয়েছে। তারপর গত ডিসেম্বরে ক্ষমতাসীন জোট সরকারে নিজের দলসহ যোগ দিয়ে নেপালের উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন লামিছান।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিত্ব ছিল লামিছানের; কিন্তু নেপালের সংবিধানে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত না হওয়ায় ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। শুক্রবারের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, নিয়ম অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর নেপালের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার কথা ছিল লামিছানের; কিন্তু তা করেননি তিনি। ফলে এই মুহূর্তে নেপালের নাগরিকও নন লামিছান। এদিকে, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর লামিছানের প্রতিক্রিয়া জানতে তার মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে গিয়েছিলেন সাংবাদিকরা; কিন্তু লামিছানে তাদের বলেন, ‘যেহেতু এই মুহূর্তে আমি কোনো দেশেরই নাগরিক নই, তাই আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করা আমার পক্ষে উচিত নয়, সম্ভবও নয়।’

তার কলাম মানেই সেদিন বাংলার বাণী অফিস সরগরম। সকাল থেকেই ফোন আসত। বিভিন্ন আড্ডায়ও আলোচনা হতো সেই কলাম নিয়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়-আশয় এবং দেশের সমসাময়িক বিষয়গুলো আকর্ষণীয় এবং সহজ করে পাঠকের কাছে তুলে ধরতেন এই সাংবাদিক। এর বাইরে প্রকৃতি, পাহাড়, নদী ও দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লিখতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের লাল পাহাড়ের মানুষের জীবনের গল্পও তুলে আনতেন। প্রায় দেড় দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। লিখেছেন অসংখ্য কলাম।

যখন সাংবাদিকতা করতেন তখন তার কাজের জায়গাটিতে তিনি ছিলেন সেরা। ছাত্ররাজনীতির জন্য যেমন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, ছাত্রনেতা হিসেবেও পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়। সফল হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রী হিসেবে। দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং ইতিহাসসমৃদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি সফল। তৃতীয়বারের মতো দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি হলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। রাজনীতির বাইরে তার আরও অনেক পরিচয়ের মধ্যে সাংবাদিক পরিচয়টাও অনেক বেশি উজ্জ্বল।

ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন স্পষ্টবাদী, সাহসী ও দেশপ্রেমিক। পাকিস্তান আমলে ছাত্র ও গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এ নেতা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং কোম্পানীগঞ্জ থানা মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) অধিনায়ক ছিলেন।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ওই ভয়াল রাতে নিহত হন তার ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি। তিনি তখন দৈনিক বাংলার বাণীর সম্পাদক। ফলে পত্রিকাটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৮১ সালে পত্রিকাটি আবার ছাপার অনুমতি পায়। ওই সময় ওবায়দুল কাদের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। সেই সঙ্গে লেখালেখি। দ্বিতীয়বার শেখ ফজলুল করিম সেলিমের (বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য) সম্পাদনায় বাংলার বাণী পত্রিকার ছাপা শুরু হওয়ার পর যুক্ত হন ওবায়দুল কাদের। তিনি পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য ও পরে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের আগপর্যন্ত তিনি সাংবাদিকতা করেছেন।

টানা ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে ওবায়দুল কাদের অসংখ্য কলাম লিখেছেন বাংলার বাণীতে। ‘ও কাদের’ নামে তিনি কলাম লিখতেন। প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন। সম্পাদকীয় বিভাগ ও অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে মিটিং করতেন। সম্পাদকীয় বিভাগের বাইরে সেই সময় তিনি বাংলার বাণীর আন্তর্জাতিক পাতাটি নিজের দায়িত্বে বের করতেন। আন্তর্জাতিক বিষয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ে তিনি খুব বেশি সচেতন ও আগ্রহী ছিলেন।

ওবায়দুল কাদেরের সেই সময়কার সহকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহকর্মী হিসেবে তিনি চমৎকার ছিলেন। তাছাড়া সাংবাদিক হিসেবেও খুব পেশাদার ছিলেন। তিনি যদি রাজনীতি না করে সাংবাদিক থাকতেন, তার অনেক লেখা এবং অসংখ্য বই আমরা পেতাম। যদিও তিনি এখন রাজনীতিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা তাকে পেয়েছি, তারা তার লেখা মিস করছি। তার লেখার জন্য অপেক্ষা করতাম। যেহেতু বাংলার বাণী ছিল বিরোধী ঘরানার পত্রিকা, তাই সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ থাকত।

ওবায়দুল কাদেরের লেখালেখি ও তার কলাম সম্পর্কে জাতীয় অধ্যাপক প্রয়াত কবীর চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘যখনি সংকট, যখনই এক অপয়া অন্ধকার ওঁৎ পেতে আসে, যখনই সমাজ ধূসরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যখনই মিথ্যা ও ইতিহাস বিকৃতির গোলকধাঁধায় নয়া প্রজন্মকে দিগভ্রান্ত করার অপচেষ্টা, যখনই রাজনীতির গৌরব কলুষতায় ঢেকে দেওয়ার অপপ্রয়াস তখনই ওবায়দুল কাদেরের এই জীবন ঘনিষ্ঠ, সত্য ও সুন্দরের আরাধনাময় সাহসী রচনা সমাজকে আলোর ইতিহাস শোনাতে পারে।’

ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকতা জীবনে সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়, রাজনৈতিক কলাম লিখেছেন অসংখ্য। কবি নির্মলেন্দু গুণ তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাংলার বাণী পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে আমার সহকর্মী ছিলেন, কলাম লেখক হিসেবেও জনপ্রিয় হয়েছিলেন।... আমি তার অলংকৃত কাব্যিক ভাষায় বক্তৃতার একজন ভক্তশ্রোতা।’

প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মূল্যায়ন ছিল, ‘ওবায়দুল কাদের শুধু রাজনীতিক নন, তিনি সাংবাদিক, তিনি বাগ্মী, তিনি লেখক। বক্তৃতায় বাংলা শব্দ উচ্চারণ, ছন্দের ব্যবহারে চারণকবি তিনি। নিবন্ধ লেখক হিসেবে যুক্তি ও বিশ্লেষণে তীব্র লক্ষ্যভেদী তিনি।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন বাংলার বাণীতে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৮৯ সালে বাংলার বাণীতে যখন জয়েন করি তখন সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাদের ভাইকে পাই। আমরা বার্তাকক্ষে বসতাম আর তিনি তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরদের রুমে বসতেন। ওনাদের আলাদা রুম ছিল। তিনি রুম থেকে বের হয়ে সবসময় আমাদের খোঁজখবর নিতেন। মাঝেমধ্যে আমাদের এখানে এসে গল্প করতেন। তিনি সহকর্মী হিসেবে খুবই আন্তরিক ও সহকর্মীবান্ধব ছিলেন।’

সেই সময়ে বাংলার বাণীতে ওবায়দুল কাদেরের আরেক সহকর্মী ও পাক্ষিক ক্রীড়াজগৎ পত্রিকার সম্পাদক দুলাল মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি তাকে ১৯৮৫ সালে পেয়েছি। আমি তখন সহ-সম্পাদক হিসেবে জয়েন করেছি বাংলার বাণীতে। ওবায়দুল কাদের তখন সহকারী সম্পাদক ছিলেন। তিনি কলাম লিখতেন। তার কলাম পাঠকের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। তার লেখার মধ্যে সাহিত্য ছিল। লেখা খুব আকর্ষণীয় ছিল। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জায়গায় যেতেন, সেসব বিষয় নিয়েও লিখতেন। তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল চট্টগ্রাম, পাহাড়-সমুদ্র খুব পছন্দ করতেন এবং এসব নিয়েও তিনি লেখালেখি করতেন। তিনি খুব আবেগী লোক ছিলেন এবং লেখার মধ্যে সেটা ফুটে উঠত। তার লেখা পাঠক পড়তে বাধ্য হতেন।’

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির মানুষ হলেও অফিসে ঢুকলে একজন সংবাদকর্মী হিসেবেই থাকতেন ওবায়দুল কাদের। রাজনীতির বিষয়টা বাইরে রাখতেন। বরাবরই তিনি শৌখিন টাইপের লোক ছিলেন। ভালো কাগজ-কলম ব্যবহার করতেন লেখার সময়। লেখার সময় আলাদা একটা মেজাজে থাকতেন। তখন খুব জরুরি না হলে কোনো বিষয় অ্যালাউ করতেন না। লেখা শেষ করলে বেশ ফুরফুরে থাকতেন। তখন আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, গল্প করতেন। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তার মনোভাব আমরা দেখতে পেয়েছি।’

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাংবাদিক সুভাষ চন্দ বাদল বাংলার বাণী পত্রিকায় ওবায়দুল কাদেরের সহকর্মী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘কাদের ভাইকে ছাত্ররাজনীতি থেকেই চিনতাম। ১৯৭৫ সালের পর যখন তিনি কারাগারে যান তখন আমিও কারাগারে। তাকে কারাগারে দেখেছি বই নিয়ে ডুবে থাকতে। বাংলার বাণীতে এসে তাকে নতুন করে পেয়েছি। সেই সময় আজিজ মিসির ও তার কলাম ছিল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তিনি সাংবাদিকবান্ধব। বাংলার বাণী অফিসেও সহকর্মীদের সবসময় সহযোগিতা করতেন। আমি রিপোর্টার হিসেবে যদি কখনো কোথাও আটকে যেতাম তিনি সহযোগিতা করতেন। কাদের ভাই সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন মেধাবী ও জ্ঞানী। তার সাহসের ঘাটতি ছিল না। তার কলামেও এর প্রভাব দেখেছি।’

ওবায়দুল কাদের ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানার বড় রাজাপুর গ্রামে জন্ম নেন। বাবা মোশারফ হোসেন সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা শুরু করেন। মা ফজিলাতুন্নেছা। ওবায়দুল কাদের বসুরহাট সরকারি এএইচসি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি ও নোয়াখালী কলেজ থেকে মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি কলেজজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন।

১৯৭৫-এর পর একনাগাড়ে দীর্ঘ আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরপর দুবার সভাপতি ছিলেন।

তার সেই সময়ের সহকর্মীরা বলেন, সাংবাদিক ওবায়দুল কাদের তথা কাদের ভাই মানেই অন্যরকম। তিনি ছিলেন খুব সংবেদনশীল। সবাইকে মেনে নেওয়ার একটা ক্ষমতা ছিল। তিনি যে এত বড় একজন রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধা, এত বড় ছাত্রনেতা, তা কখনই সাংবাদিকদের কাছে মনে হতো না। মনে হতো, কাদের ভাই যেন সাংবাদিকতার মধ্যেই ডুবে আছেন। কোনো রিপোর্টার বা সাব-এডিটর অনুবাদ করতে সমস্যায় পড়েছেÑ কাদের ভাইয়ের কাছে গেলেই সমাধান। নিজের রুমে, ডেস্কে বসিয়ে বুঝিয়ে দিতেন। আর তার টেবিলে ছিল সবসময়ই গাদা গাদা বই।

বাংলার বাণীর সেই সময়ের একাধিক সাংবাদিক ওবায়দুল কাদের সম্পর্কে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাদের ভাই ছিলেন সাংবাদিকতার প্রতি পুরো নিষ্ঠাবান। তার কাছে অনেক কিছু শিখেছি। তিনি দীর্ঘক্ষণ কোথাও বসে থাকতেন না। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি রুম থেকে বেরিয়ে অন্য সহকর্মীদের টেবিলে টেবিলে আড্ডা দিতেন। সেখানে হয়তো আমরা চায়ের অর্ডার দিয়েছি। চা আসতে না আসতেই তিনি উঠে যেতেন। তারপর আবার তাকে চায়ের কাপ নিয়ে খুঁজতে হতো কাদের ভাই কই...।

সীমাহীন আনন্দ নিয়ে মানুষ সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়। এরপরই তার মধ্যে যে স্বপ্নটি দানা বাঁধে তা হচ্ছে পদোন্নতি। কার কীভাবে পদোন্নতি হবে তা আইনকানুন, নিয়ম-নীতি দিয়ে পোক্ত করা। পুরো বিষয়টি কাচের মতো স্বচ্ছ। এরপরও পদোন্নতি হয় না। দিন, মাস, বছর পার হয়ে যায়, কাক্সিক্ষত পদোন্নতির দেখা মেলে না।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হয়। বাকি ক্যাডারে হতাশা। তার চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি নন-ক্যাডারে। ক্যাডার কর্মকর্তারা নিজের পদোন্নতির ষোলো আনা বুঝে নিয়ে ঠেকিয়ে দেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি। সংখ্যায় বেশি হওয়ায় নন-ক্যাডাররা একজন আরেকজনকে নানা ইস্যুতে আটকাতে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেন। সরকারের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কর্মচারী। সেই হিসেবে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবলের পদোন্নতি হয় না। পে-কমিশন হলেই কর্মচারীদের পদোন্নতির জন্য করুণা উথলে ওঠে। এমনকি ব্লকপোস্টে যারা আছেন, তাদের জন্যও পদোন্নতির বিকল্প সুবিধা বাতলে দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্মচারীদের পদোন্নতি উপেক্ষিতই থাকে।

যখন সময়মতো পদোন্নতি হয় না, তখন নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে থাকে। এসব সমস্যা সংশ্লিষ্ট দপ্তর-অধিদপ্তরের চৌহদ্দি পেরিয়ে আমজনতাকেও প্রভাবিত করে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা আর সঙ্গে কর্মচারীরা যখন বুঝতে পারেন পদোন্নতির আশা তাদের নেই, তখন তারা দুহাতে টাকা কামানোর ধান্দায় মেতে ওঠেন। এতে করে ঘুষের সংস্কৃতি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। অকার্যকর পথে হাঁটে রাষ্ট্র। সাধারণ মানুষ টাকা ছাড়া তাদের কাছ থেকে কোনো সেবা পায় না, ব্যবসায়ীরা নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে ব্যবসায় আসেন না, ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতি না থাকায় মুখ ফিরিয়ে নেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। প্রধানমন্ত্রীর বারবার আহ্বানেও বিনিয়োগকারীরা সাড়া দেন না। সাধারণ মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দেওয়ার বাণীতেও উদ্বুদ্ধ হন না সংশ্লিষ্টরা।

এই পরিস্থিতিতে অনিয়ম আটকে রাখার সব কৌশলই ব্যর্থ হচ্ছে। যথাযথ তদারকি না থাকায় বিভাগীয় ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫০টি অডিট আপত্তি ঝুলে থাকায় অডিট প্রতিষ্ঠানগুলোও আগ্রহ হারিয়ে নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছে অনিয়মে। দন্তহীন বাঘে পরিণত হওয়ার তথ্য সাংবাদিকদের জানান দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান নিজেই।

নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদোন্নতির বড় একটা অংশ আটকে রাখে মন্ত্রণালয়গুলো। এই আটকে রাখার কারণ হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের স্বার্থ। বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিলে নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ওপরের পদে বসাতে হবে। এতে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের এককালীন লাভ; অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে একবার পদোন্নতি দেওয়া যাবে। কিন্তু পদোন্নতি না দিয়ে সংশ্লিষ্টদের চলতি দায়িত্ব দিলে বছরজুড়ে টাকা আয় করতে পারেন নীতিনির্ধারকরা। দপ্তর, অধিদপ্তরে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তদের আয় অনুসারে নীতিনির্ধারকদের মাসোহারা দিতে হয়। নন-ক্যাডারদের পদোন্নতি দেওয়া হলে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে আইন বা বিধি-বিধানের ফাঁকফোকর গলিয়ে নন-ক্যাডার এবং কর্মচারীদের পদোন্নতি আটকে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়।

সরকারি কর্মচারী সংহতি পরিষদের সভাপতি নিজামুল ইসলাম ভূঁইয়া মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সচিবালয় এবং সারা দেশের সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতির মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। নন-ক্যাডারের কিছু বিষয় ছাড়া সচিবালয়ের কর্মচারীরা সময়মতো পদোন্নতি পায়। কিন্তু সচিবালয়ের বাইরে পদোন্নতি হয় না বললেই চলে। সচিবালয়ে মাত্র ১০ হাজার কর্মচারী আছেন। সচিবালয়ের বাইরে আছেন ১০ লাখের বেশি। এসব কর্মচারীর পদোন্নতি নিয়ে বহু বছর ধরে চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সমস্যা নিয়ে কাজ করার জন্য একটি কমিটি করে দিয়েছে। কমিটি কিছু সুপারিশ করেছে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। এরপর এর কোনো অগ্রগতি নেই। যেখানে সরকারপ্রধান বলেন, চাকরিজীবনে সবাই যেন কমপক্ষে একটি পদোন্নতি পায়। সেখানে বহু কর্মচারী কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যাচ্ছেন। সরকারপ্রধানের নির্দেশনা উপেক্ষা করেন আমলারা। তাদের আগ্রহ কেনা-কাটায়, বিদেশ ভ্রমণে, নতুন জনবল নিয়োগে। এসব করলে তাদের লাভ। কর্মচারী পদোন্নতি দিতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এর নিশ্চয়ই একটা শেষ আছে। বৈষম্যের পরিণতি কী হয়, তা অনেক দাম দিয়ে বিডিআর বিদ্রোহে আমরা দেখেছি।’

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নন-ক্যাডারদের পদোন্নতি ঝুলছে বছরের পর বছর। এই অধিদপ্তরের কয়েক শ কর্মকর্তা পাঁচ বছর আগেই পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। নানা কায়দা-কানুন করে তাদের পদোন্নতি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সংশ্লিষ্টদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করে তাদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিলেও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন করে জ্যেষ্ঠতার তালিকা করার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকা করার পর এখন তাদের পারিবারিক সদস্যদের তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই সংস্থা নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদেরও তথ্য তালাশ করছে। তাদের আত্মীয়দের মধ্যে কে কোন দলের সমর্থক তার তথ্য নিচ্ছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।

গত মাসে শেষ হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে দায়িত্ব পালন করছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের সুরম্য ভবনে দায়িত্ব পালন করলেও ওই নন-ক্যাডার কর্মকর্তার মনের অবস্থাটা মনোহর ছিল না। কেমন আছেন জানতে চাইলে ওই নন-ক্যাডার কর্মকর্তা বলেন, ‘ভালো নেই। চাকরি করছি, পদোন্নতি নেই। ২০১৫ সালের আগে পদোন্নতি না পেলেও টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ছিল। তাও তুলে দেওয়া হয়েছে। তুলে দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল সময়মতো পদোন্নতি হবে, ব্লকপোস্টধারীদের দেওয়া হবে বিশেষ আর্থিক সুবিধা। এসবের কোনোটাই হয়নি।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে একটি প্রশাসনিক আদেশ খুবই পরিচিত। সেই প্রশাসনিক আদেশ ১৬/২০১৮ অনুযায়ী ৭০ ভাগ কর্মকর্তা সরাসরি নিয়োগ হবে। আর ৩০ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ৭০ ভাগ কর্মকর্তা সরাসরি নিয়োগের ফলে বিমানে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মকর্তা বেশি। নীতিনির্ধারকদের নতুন জনবল নিয়োগে আগ্রহ বেশি। পুরনোদের পদোন্নতি দিয়ে ওপরের পদ পূরণের চেয়ে তারা নতুন নিয়োগে যান। ফলে কারও চাকরিজীবনে একবারও পদোন্নতি হয় না। নামমাত্র যে পদোন্নতি হয় তা অনিয়মে ভরপুর।

নন-ক্যাডার ছাড়াও ১৩তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত পদোন্নতি হয় না বললেই চলে। প্রতিটি দপ্তরে এসব গ্রেডের পদোন্নতি আটকে আছে। অথচ এসব গ্রেডেই বেশি লোক চাকরি করছেন। সরকারের মোট জনবল প্রায় ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ৯২৭ জন। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ২৩ শতাংশ পদের মধ্যেও নন-ক্যাডার রয়েছেন। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৭৭ শতাংশ পদই ১৩তম থেকে তার পরের গ্রেডের। এতে করে সহজেই বোঝা যায় সরকারের জনবলের বড় অংশই পদোন্নতির চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। সরকারের জনবলের এই বিশাল অংশ যখন পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তখন তারা নানা অনিয়মে ঝুঁকে পড়েন।

বেশির ভাগ দপ্তর, অধিদপ্তর পরিচালনা করেন বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তারা তাদের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে ক্যাডার কর্মকর্তাদের দপ্তর, অধিদপ্তরে পাঠান। প্রেষণে গিয়ে অনেক কর্মকর্তা শুধু রুটিন কাজটুকুই করতে চান। শূন্যপদে জনবল নিয়োগ বা পদোন্নতি রুটিন কাজ না হওয়ায় তা উপেক্ষিত থাকে। তা ছাড়া পদোন্নতি দিতে গিয়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়; বিশেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী বা সচিব তাদের পছন্দের লোককে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সংস্থার প্রধানকে চাপ দেন। এই চাপ উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ না থাকায় অযোগ্য লোককে পদোন্নতি দিতে হয় সংস্থার প্রধানকে। এই জটিলতা থেকে দূরে থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের পদোন্নতি দেওয়া থেকেও দূরে থাকেন সংস্থার প্রধানরা।

নন-ক্যাডার কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের পদোন্নতি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের ১৪ গ্রেডের একজন কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাইরের লোকের ইচ্ছাটাই জাগে না আমাদের পদোন্নতি দিতে। আমাদের দপ্তরপ্রধান মহাপরিচালক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। অতিরিক্ত মহাপরিচালকও অনেক সময় প্রশাসন ক্যাডার থেকে প্রেষণে আসেন। তাদের কেন ইচ্ছা জাগবে আমাদের পদোন্নতি নিয়ে। যদি এসব পদে ফুড ক্যাডারের কর্মকর্তা থাকতেন, তাহলে তারা খাদ্য বিভাগের সমস্যা বুঝতেন। তা ছাড়া নিয়োগ বিধি সংশোধনের নামে আমরা দীর্ঘদিন একই পদে আটকে আছি।’

গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে এক আবেদনে জানান, ‘বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কর্মরত। এর বিপরীতে ক্যাডারবহির্ভূত সংরক্ষিত পদের সংখ্যা ২৬৭টি, যা খুবই নগণ্য। ফলে একই পদে ২০-২২ বছরের বেশি সময় কর্মরত থাকার পরও অনেকে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। পদোন্নতি না পাওয়ায় সৃষ্ট হতাশার ফলে কর্মস্পৃহা নষ্ট হচ্ছে।’

সরকার এ সমস্যা থেকে কীভাবে বের হতে পারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানে সরকার সব সময়ই কাজ করে। কিন্তু এ চেষ্টা জটিলতার তুলনায় কম। এ বিষয়ে আরও এফোর্ট দিতে হবে।